বিদ্রোহী (দ্বিতীয় খন্ড)

বাণী

আমি	বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্ণি,
আমি	ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি	উন্মন মন উদাসীর,
আমি	বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি	বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি	অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
আমি	অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
	চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি	গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি	চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
আমি	চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি	যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি	উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি	পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি	আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি	মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি	তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি	সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি	অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
	মহা-সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
	ঘুম্‌ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্‌ঝুম
	মম বাঁশরীর তানে পাশরি’।
আমি	শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি	পরশুরামের কঠোর কুঠার,
	নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
	মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি	সেই দিন হব শান্ত,
যবে	উত্‍পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না —
	অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না —
	বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি	সেই দিন হব শান্ত।
আমি	বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি	স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি	বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি	খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি	চির-বিদ্রোহী বীর —
	বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
	শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল	বীর -
	বল উন্নত মম শির!
বল	বীর, বল বীর।

প্রেম আর ফুলের জাতি কুল

বাণী

প্রেম আর ফুলের জাতি কুল নাই,
বুল্‌বুলি সে কথা ভুলিল কি হায়।
সে কেন তবে আসে না
রাতের ফুল মোর হাতে শুকায়।।
রাজ-বাগিচার ফুল হোক যত গরবী
পথের ফুলেও আছে তা’রি মত সুরভি,
রসের পুতলী হয় পথের ভিখারিনী
		যদি প্রেম পায়।।

বনের তাপস কুমারী আমি গো

বাণী

বনের তাপস কুমারী আমি গো, সখি মোর বনলতা।
নীরবে গোপনে দুইজনে কই আপন মনের কথা।।
যবে 	গিরিপথে ফিরি সিনান করিয়া,
	লতা টানে মোর আঁচল ধরিয়া,
হেসে বলি, ওরে ছেড়ে দে, আসিছে তোদের বন-দেবতা।।
ডাকি যদি তারে আদর করিয়া — ওরে বন বল্লরি,
আনন্দে তার ফোটা ফুলগুলি অঞ্চলে পড়ে ঝরি'।
	লুকায়ে যখন মোর দেবতায়
	আবরিয়া রাখে কুসুমে পাতায়,
চরণে আমার (ও সে) আসিয়া জড়ায় যবে হই ধ্যানরতা।।

আমি বাউল হ’লাম ধূলির পথে

বাণী

আমি বাউল হ’লাম ধূলির পথে ল’য়ে তোমার নাম।
আমার একতারাতে বাজে শুধু তোমারই গান, শ্যাম।।
	নিভিয়ে এলাম ঘরের বাতি
	এখন তুমিই সাথের সাথি,
আমি যেখানে যাই সেই সে এখন আমার ব্রজধাম।।
আমি আনন্দ-লহরি বাজাই নূপুর বেঁধে পায়ে,
শ্রান্ত হ’লে জুড়াই তনু বন-বীথি বটের ছায়ে।
	ভাবনা আমার তুমি নিলে
	আমায় ভিক্ষা-পাত্র দিলে
কখন তুমি আমার হবে পূরবে মনস্কাম।।

১. শ্রান্ত হলে জুড়াই তবু বংশী-বটের ছায়ে।

প্রিয় যাই যাই ব’লো না

বাণী

প্রিয় যাই যাই ব’লো না, না না না
আর ক’রো না ছলনা, না না না॥
আজো মুকুলিকা মোর হিয়া মাঝে
না-বলা কত কথা বাজে,
অভিমানে লাজে বলা যে হ’ল না॥
কেন শরমে বাধিল কে জানে
আঁখি তুলিতে নারিনু আঁখি পানে।
প্রথম প্রণয়-ভীরু কিশোরী
যত অনুরাগ তত লাজে মরি,
এত আশা সাধ চরণে দ’লো না॥

মুখে তোমার মধুর হাসি হাতে কুটিল ফাঁসি

বাণী

মুখে তোমার মধুর হাসি হাতে কুটিল ফাঁসি।
সুন্দর চোর, চিনি তোমায় তবু ভালোবাসি।।
	শত ব্রজে কেঁদে মরে
	শত রাধা তোমার তরে,
কত গোকুল ডুবলো অকূল আঁখির নীরে ভাসি'।।
কত নারীর মন গেঁথে, নাথ, পরলে বন-মালা,
যমুনাতে ডুবালে শ্যাম কত কুলের বালা।
	দেখাও আসল হাত দু'খানি-
	করাল গদার চক্রপাণি,
তব এ দু'টি হাত ছলনা, নাথ, বাজাও যে হাতে বাঁশি।।